আমাদের দেশে এখনও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের নিয়োগে পিএইচডি থাকা বাধ্যতামূলক নয়। এর একটা কারণ হয়ে থাকতে পারে সরকারি চাকুরির সাথে এক ধরনের “সমতা রক্ষার তাগিদ”। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরুর যে বেতন কাঠামো তা সরকারি প্রথম গ্রেডের সমান (জাতীয় বেতন স্কেল এ গ্রেড ৯)। পাকিস্তানের চিত্রও মোটামুটি এরকমই। তবে এই অঞ্চলে ধরে নেয়া হয় যে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক চাকুরিতে যোগদানের পর শিক্ষা এবং গবেষণায় উৎকর্ষ অর্জনের জন্য একটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার উচ্চতর গবেষণা সম্পন্ন করবেন।
অন্য সব পেশার মতো বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতা পেশারও অনেক চড়াই উতরাই আছে। আছে কিছু না বলা প্রত্যাশা, সামগ্রিক ভাবে তা হলো একটা ভালো পিএইচডি। তবে অ্যাকাডেমিক লাইফ এর সর্বোচ্চ ডিগ্রি, পিএইচডি, একটা ভালো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বৃত্তিসহ সম্পন্ন করা বাস্তবিকভাবেই চ্যালেঞ্জিং। আমাদের মতো যাদের নিজস্ব আর্থিক সংস্থানে পিএইচডি করার স্বক্ষমতা নেই, তাদের জন্য ব্যাপারটি রীতিমতো একটা যুদ্ধ। আবার আমাদের বয়স বাড়ার সাথে সাথে তা আরো কঠিন থেকে কঠিন মনে হতে থাকে মূলত নিজের উপর আস্থা এবং বিশ্বাস সময়ের সাথে সাথে কমে যায় বলে।
আমি ছিলাম শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এর ২০০৪ ব্যাচ এর শিক্ষার্থী। সেশন জ্যাম থাকায় আমাদের ব্যাচ থেকে যারা শুধু ব্যাচেলর করেই বাইরে পড়তে গেছে তারা ২০১১ সেশনে উচ্চশিক্ষার্থে দেশের বাইরে চলে যেতে শুরু করেছে। আমার যেহেতু বাইরে পড়তে যাবার প্রক্রিয়া নিয়ে কোন পারিবারিক ইনডাকশন ছিলোনা, সাথে ছিলাম খুবই ইন্ট্রোভার্ট, কাজেই বিশ্ববিদ্যালয় এর ব্যাচেলর লাইফে এই প্রক্রিয়ার সাথে ইনডাকশন হয়নি। যা হয়েছে প্রচুর নিজের মতো করে পড়েছি, ফলাফল ভালো হয়েছে।
এই প্রক্রিয়ার সাথে আমার ইনডাকশন হয় প্রথম যখন শুনতে পাই আমাদের ক্লাসের বেশ কয়েকজন একসাথে বাইরে যাবার অফার পায়। মানসিক ভাবে সেই সময় ছিল খুব ধাক্কার মতো। সেই ধাক্কায় পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানার আগ্রহ তৈরী হয়, অবশেষে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে একটা ধারণা জন্মায়।
আমি IELTS দিতে বসি ২০১২ সালে। আর্থিক টানাপড়েন ছিল, তাই জিন্দাবাজারের কিছু বই কিনে নিজে নিজে সমাধান করি প্রথম দিকে। সাথে শাম্মীর সাতে ২টা মক টেস্ট দেই আম্বরখানার একটা কোচিং সেন্টার এ। লিসেনিং, রিডিং আর রাইটিং-এ মোটামুটি ভালোই ছিলাম, বুঝতাম। সমস্যা ছিল স্পিকিং এ। বোমা ফাটালেও মুখে কথা হয় না। তখন “খান সিরিজ” এর কিছু বই পাওয়া যেত, যেখানে রিয়েল স্পিকিং টেস্টে কী ধরনের প্রশ্ন হয় এবং সম্ভাব্য উত্তরও দেয়া থাকতো। IELTS এর শুরুর দিকে পরীক্ষার্থীর নিজের সম্পর্কে কিছু বলতে হয়। আমি এতো নাইভ ছিলাম যে শুরুতে “নিজে কি করতে চাই?” টাইপ উত্তরও সেই বই থেকে আয়ত্তের চেষ্টা করেছি। অনেকবার করতে করতে হঠাৎ মাথায় প্রশ্ন আসে, আসলেই এই বইয়ে যা লক্ষ্য বলা হচ্ছে তা কি আমি তা করতে চাই? তখন থেকেই আসলে আমার ব্যক্তিগত ট্রান্সফর্মেশনের শুরু, নিজে কি হতে চাই তার উত্তর খুঁজে বেড়াই তখন থেকেই। নিজে উত্তর খুঁজতে গিয়ে বুঝেছি, এই প্রশ্নের জন্য আমার মনে আগে থেকে প্রস্তুত কোনো উত্তর ছিল না। যা কিছু পাওয়া যায় তা নিয়ে নিজেই কনফিউজড। আসলে তখন পর্যন্ত জীবনের লক্ষ্যই ছিল “সারভাইভাল” বা “মাথা গুজার মতো কিছু একটা করতে পারা” টাইপ।
যাই হোক, নতুন যে যাত্রাটা শুরু হয় তার প্রথম সফলতা আসে ২০১৫ সালে, জাপান থেকে (তত্তরি বিশ্ববিদ্যালয় সাথে মনোবুশো বা মেক্সট পিএইচডি স্কলারশিপ)। এখানে উল্লেখ্য যে মনোবুশো স্কলারশিপ হয়েছিল আমার মাস্টার্স এর ফলাফল, পরবর্তীতে প্রফেসরের ফিল্ডের সাথে এলাইন করা প্রজেক্টে গবেষণা কাজের অভিজ্ঞতা আর জোরালো রিকোমেন্ডেশনের জন্য। তখন আমার বয়স ছিল ২৭। তারুণ্য তখনো জীবন থেকে পালাতে শুরু করেনি! কিন্তু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার চাকুরি তখন অস্থায়ী (শিক্ষা ছুটিজনিত শূন্য পদের বিপরীতে) থাকার দরুন আমি জাপানে যেতে পারিনি। সেই ধাক্কা আবারো আমার উচ্চশিক্ষার যাত্রায় ছেদ এনে দেয়। অ্যাকাডেমিক প্রত্যাশা আর নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা থেকে আবারো মনোবল ফিরে আসে, ২০১৭ এর শেষে সেই ঘুম ভাঙে। প্রথম ধাপ হিসেবে আবারো IELTS দেই (লাইফে চতুর্থবার), কিন্তু এবারই প্রথম ৭.০ স্কোর এর মাইলফলক অতিক্রম করতে পারি, যা উৎসাহ আরো বাড়িয়ে দেয়।
জাপান যেহেতু বন্ধ, সাথে ২০১২-২০১৫ তে ইউরোপের অসংখ্য স্কলারশিপ এ ব্যর্থতা এবারের লক্ষ্য স্থির করে অস্ট্রেলিয়া। এখানে আদনান ভাইয়ের একটা বিশাল প্রভাব আছে, সাথে একটা ব্যর্থতার দগদগে ঘা ছিল—একজন সুপারভাইজারের সাথে কথাবার্তা অনেক দূর এগোলেও শেষ পর্যন্ত সেটি হয়নি; সেটি মেনে নেওয়া ছিল কষ্টকর। তাই শুরু হয় লিস্ট করে করে প্রফেসরদের সাথে যোগাযোগ। সিডনি ইউনিভার্সিটির ড্রাগ ডিসকভারি পিএইচডি প্রোগ্রাম আর গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটির ক্যান্সার নিয়ে পিএইচডি প্রোগ্রামের আবেদন কয়েক ধাপ আগায়। প্রথম রিজেকশন আসে সিডনি থেকে। তখনও গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটির প্রফেসর আলফ্রেড লামের সাথে আবেদনটি টিকে ছিল। শেষপর্যন্ত সেটাও রিজেক্টেড হয়।
মধ্যখানে কার সাথে জানি কথা হয় (নাম মনে পড়ছেনা, দুঃখিত) সাম্প্রতিক ব্যর্থতা নিয়ে, শেষ পর্যন্ত জানতে পারি ইউনিভার্সিটির প্রফেসরদের লিস্ট করে করে ই-মেইল করার চাইতেও আরো একটা উপায় আছে পিএইচডি এর ফাঁকা পজিশন খুঁজে পাবার। এ ধরণের পজিশন এর বিজ্ঞাপন প্রকাশ হয় এমন কিছু গ্রহণযোগ্য সাইট আছে, সেগুলি খুব কার্যকর। দুটি ওয়েবসাইটের নাম দিচ্ছি।
আমি ফাইন্ড এ পিএইচডি সাইটে মাইক্রোবায়োলোজির (অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্স) একটা প্রজেক্টে আবেদন করি গভীর রাতে। সকালে দেখি প্রফেসর উনার পারসোনাল ই-মেইল এ আমাকে সিভি পাঠাতে বলেছেন। সিভি পাঠানোর পর একটি অনলাইন মিটিং হয়, তার এক মাসের মধ্যেই ইউনিভার্সিটি অফ ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া থেকে স্কলারশিপ সহ পিএইচডি এর অফার পাই। তখন ২০১৯ সালের মাঝামাঝি। কিন্তু ততদিনে আমার কমনওয়েলথ স্কলারশিপ এর নোটিফিকেশন অফ অ্যাওয়ার্ড এর লেটার চলে এসেছে। আমি আমার কিংস কলেজে ভর্তির কাগজপত্র এবং মূল রেকমেন্ডেশন লেটার এর স্ক্যান কপি পাঠিয়ে অপেক্ষা করছি কনফারমেশন অফ অ্যাওয়ার্ড এর জন্য। শেষ পর্যন্ত লন্ডন কে উপেক্ষা করতে পারিনি ফলে পার্থে আর যাওয়া হয়নি।
কমনওয়েলথ স্কলারশিপ এর জন্য আমি প্রথম আবেদন করি ২০১৮ সালের রাউন্ডে। এই স্কলারশিপের জন্য বাংলাদেশ থেকে দুটি নমিনেশন এজেন্সি আছে,
(১) বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে থেকে প্রার্থী বাছাই করে নমিনেশন পাঠায় লন্ডনে)
(২) শিক্ষা মন্ত্রণালয় (যারা প্রাপ্ত বয়স্ক বাংলাদেশিদের মধ্যে থেকে প্রার্থী বাছাই করে নমিনেশন পাঠায় লন্ডনে; রুট -ওপেন ফর অল)
কিন্তু যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন একই ধরনের কাজ করে, তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রার্থী সিলেকশনের জন্য কমিশনের সাহায্য নেয়। এজন্য বাংলাদেশের সবাই মনে করে এই স্কলারশিপ শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য বরাদ্দ, এজন্য অনেকে আবেদনই করেন না!
যাই হোক, ২০১৮ রাউন্ডে আমি আবেদন করি প্রথম চ্যানেল এ। এই চ্যানেলে প্রথমে একজন প্রার্থীকে আবেদন করতে হয় নিজ বিভাগে, একই বিভাগ থেকে একাধিক প্রার্থী হলে বিভাগীয় সভাপতি নিজ বিভাগের নীতিমালা অনুসারে একজনকে বাছাই করে সংশ্লিষ্ট অনুষদের ডিন অফিসে প্রেরণ করে। অনুষদের সবগুলি বিভাগ থেকে প্রাপ্ত আবেদনের মধ্যে থেকে একজনকে ডিন অফিসের নীতিমালা অনুসারে বাছাই করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা অফিসে প্রেরণ করে। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা আবেদন সমূহ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় তার নীতিমালা অনুসারে তাদের জন্য সংরক্ষিত কোটা (সর্বোচ্চ কতজন নমিনেশন দিতে পারবে) অনুসারে নির্বাচিত একটি তালিকা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এ প্রেরণ করে। তারপর হয় মূল যাচাই বাছাই। ২০১৮ সালে আমি শুরুর দিকেই বাদ পড়ে যাই, কিন্তু এই পুরো প্রক্রিয়া, কমনওয়েলথ স্কলারশিপ কিভাবে কাজ করে, সম্পর্কে অবগত হই।
২০১৮ সালের শেষ দিকে কমনওয়েলথ স্কলারশিপ ২০১৯ রাউন্ডের জন্য আবার আবেদন করি, তবে এবার “ওপেন ফর অল” রুটে, উদ্দেশ্য অন্তত ঢাকায় গিয়ে নিজেকে উপস্থাপনের সুযোগটা যেন পাই। ইনিশিয়ালি এক পৃষ্ঠার আবেদন পত্রের সব ঘর পূরণ করা থাকলে এবং গুরুত্বপূর্ণ সংযুক্তিসমূহ (IELTS স্কোর, সুপারভাইজারের সাথে যোগাযোগের প্রমাণ, অথবা যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত অফার লেটার) আবেদনের সাথে থাকলে প্রায় সবাইকেই ইন্টারভিউ এর জন্য ডাকা হয়। আমাদের ইন্টারভিউ ছিল ২০১৮ সালের ডিসেম্বর এর ৮ তারিখ, রোজ শনিবার। সারা বাংলাদেশ থেকে সম্ভবত ৫ জনকে ডেকেছিল “জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি” সাবজেক্টে। বোর্ডে ছিলেন ৭-৮ জন সদস্য। তখন আমাদের চিকুনগুনিয়ার একটি বড় স্টাডি প্রকাশিত হয়েছিল, তবে লেখকের সংখ্যা ছিল ২০-এরও বেশি। আমার ইন্টারভিউয়ের একটা বড় অংশই ছিল অথর নাম্বার এর ব্যাখ্যায়। আরেকটা বড় পার্ট ছিল প্রস্তাবিত পিএইচডি প্রজেক্ট এর প্রসপেক্ট নিয়ে।
পরের দিন, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৮, জানতে পারি আমি বাংলাদেশ থেকে “জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি” সাবজেক্টে সিলেকশন পেয়েছি। তারপরের ধাপ হলো Electronic Application System এ ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮ এর মধ্যে আবেদন সম্পন্ন করা। এই আবেদন পত্র সম্পর্কে আগে থেকে ধারণা ছিলোনা, সাথে হাতে মাত্র ১০ দিন সময়, এর মধ্যে সব সম্পন্ন করতে হবে। এই ফর্মে আবার পিএইচডি গবেষণা প্রজেক্ট এর “ইম্প্যাক্ট” সম্পর্কিত অনেক গুলি ছোট ছোট রচনা লিখতে হয়। নিজের প্রজেক্ট সম্পর্কে খুব ভালো ধারণা না থাকলে এই প্রজেক্টে পিএইচডি করলে বাংলাদেশ কীভাবে উপকৃত হবে তা ভালোভাবে লিখা খুব মুশকিল। আমাকে এই প্রক্রিয়ায় সাহায্য করেছিল আমার রিসার্চ মেনটররা, তাদের প্রতি অনিঃশেষ কৃতজ্ঞতা।
২১ জুন ২০১৯ কমনওয়েলথ স্কলারশিপ এর কনফারমেশন অফ অ্যাওয়ার্ড লেটার পাই। মনোবুশো স্কলারশিপ হারানোর ঠিক চার বছর পর, আমি ২০১৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর লন্ডনে পড়তে যাই। এই চার বছরে বয়স বেড়েছে, শরীরে জমেছে মেদ, আরাম করার অভ্যাস জেঁকে ধরেছে কিন্তু পাল্লা দিয়ে কমেছে আত্মবিশ্বাস। সেই অবস্থায় লন্ডনের শুরু কেমন হবে তা নিয়ে উত্তেজনা ছিল বেশি, তবে উৎকণ্ঠা যে ছিলোনা তা বলবো না। সেই উৎকণ্ঠার দেখা মেলে কিংস কলেজ লন্ডনের প্রথম দিনেই। সে গল্প থাকবে পরের পর্বে।
