থ্যালিডোমাইডঃ অনিচ্ছাকৃত পরিণতি, ট্র্যাজেডি এবং মুক্তির শিক্ষা
এই যে আমরা আজ এতো দিকে নিজেদের ব্যস্ত রাখতে পারছি তার পিছনে ঔষধ শিল্পের অবদান কোন ভাবেই কম নয়। যদিও নিত্য নতুন সমস্যা তৈরি হচ্ছে এবং এগুলির সমাধান আসছে। ঔষধ যদিও রাসায়নিক সংশ্লেষণের দ্বারা প্রস্তুত হয়, কিনত এর আবিষ্কার এর জন্য প্রয়োজন জ্ঞানের বহু শাখার নিবিড় পর্যালোচনা। আজ যে ঔষধের গল্প বলবো তা নানাবিধ কারণে খুবই আলোচিত। এর ইতিহাস জানলে ঔষধ আবিষ্কারের অনেক কিছু জানা যায়।
শুরুর কথা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সংক্রামক ব্যাধির প্রকোপ বাড়ে। পেনিসিলিন তখন খুব কার্যকর এন্টিবায়োটিক। তখন জার্মান ঔষধ প্রস্তুত কারক প্রতিষ্ঠান গ্রুনেন্থল, Chemie Grünenthal GmbH, পেনিসিলিন বিক্রি করে বেশ আর্থিক সফলতা পায়। সেই অর্জনের টাকা দিয়ে তারা নতুন ওষুধ আবিষ্কারের চেষ্টায় নামে। তারই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে তারা আবিষ্কার করে মিরাকল ড্রাগ থ্যালিডোমাইড। বিভিন্ন রোগের ঔষধ হিসেবে কাজ করে, সাধারণ ঠাণ্ডা-কাশি, মাথাব্যথা থেকে নিদ্রাহীনতা পর্যন্ত! এই কোম্পানিটি যেহেতু পেনিসিলিন বিক্রির কারণে বিখ্যাত আর মানুষ মধ্যে ইতোমধ্যেই পেনিসিলিনের বদৌলতে বুঝতে শুরু করেছে ঔষধ মিরাকল এর মতোই কাজ করে। তাই এই নতুন ঔষধকে মানুষ খুব সাদরে গ্রহণ করল। ১৯৫৬ সালের জুলাই মাসের কোন ধরনের প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রির জন্য অনুমোদন পায় এই থ্যালিডোমাইড এবং ১৯৫৭ থেকে ফার্মেসিতে পাওয়া যেত। এই ঔষধ এর জনপ্রিয়তা মুহূর্তেই ছড়িয়ে গেল সারা বিশ্বে। বিশ্বের ১৪ টি কোম্পানি ৪৬ টি দেশে ৩৭ টি ভিন্ন ভিন্ন নামে এই ঔষধের মার্কেটিংয়ের স্বত্ব পায় (স্রোতের বিপরীতে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ফুড এন্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন, তারা অনুমোদন দেয়নি বরং করা নজরদারীতে এই ঔষধ আসলেই নিরাপদ কি না তা পর্যবেক্ষণ করছিল)। সেইসাথে আসতে থাকে প্রচুর মুনাফা এবং চলতে থাকে আরও বহুমুখী গবেষণা এই থ্যালিডোমাইড নিয়ে।

(Photo by Leonard McCombe//Time Life Pictures/Getty Images)
গর্ভবতী মহিলাদের প্রথম দিকে “মর্নিং সিকনেস” খুবই স্বাভাবিক সমস্যা, সাঁরা পৃথিবীতেই একই রকম দেখা যায়। দেখা যায় থ্যালিডোমাইড আশ্চর্যজনক ভাবে “মর্নিং সিকনেস” এর বিরুদ্ধে কাজ করে। পরবর্তীতে গর্ভবতী মহিলাদের “মর্নিং সিকনেস” এর প্রশমনের জন্য থ্যালিডোমাইড ব্যবহার করা শুরু হয়। ১৯৬০ সালের মধ্যেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে অভিযোগ আসতে থাকে হাজার হাজার বাচ্চার জন্ম হচ্ছে বিকলাঙ্গ হয়ে। কোন শিশুর হাত নেই, কারো পা নেই, কারো চোখ বা মুখে সমস্যা! ১৯৬০ সালে ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নালে প্রথম রিপোর্ট হয় “Is Thalidomide to Blame?” শিরোনামে। ১৯৬১ সালে অস্ট্রেলিয়া থেকে ল্যানসেট এ ছাপা প্রবন্ধে দেখানো হয় থ্যালিডোমাইড আর বিকলাঙ্গতার সম্পর্ক। তারপর ১৯৬১ সালের ২৬ নভেম্বর এই ঔষধের বাজারজাতকরণ বন্ধ হয়ে যায়। লন্ডনের সাইন্স মিউজিয়ামের এক রিপোর্ট অনুসারে ধারণা করা হয় ১০,০০০ শিশুর জন্ম হয়েছে থ্যালিডোমাইড জনিত বিকলাঙ্গতা নিয়ে। যার অর্ধেকই বেশি দিন পৃথিবীতে বাঁচতে পারেনি। দেশে দেশে পরিবারগুলি কি নিষ্ঠুরতা আর আত্মগ্লানি নিয়েই না পার করেছে সেই সময়! মায়েরা কতো বিষাদে ভুগেছেন নিজেদের সাময়িক স্বস্তির জন্য সেবন করা ঔষধের প্রতিক্রিয়া নিজের সন্তানের মাঝে দেখে দেখে!
কেন হয়েছিল এই কেলেঙ্কারি?
মূলত ১৯৫০ এর দশকে এটা প্রতিষ্ঠিত ছিলনা যে কোন ঔষধ এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া প্লাসেন্টার বাঁধা পেড়িয়ে ভ্রূণের ক্ষতি করতে পারে। আর থ্যালিডোমাইড এর ক্ষেত্রে গর্ভবতী নারীদের নিয়ে কোন গবেষণাও করা হয় নি। মূলকথা ঔষধ প্রশাসনের কড়াকড়িতে যে দুর্বলতা ছিল তার ফাঁক গলেই ঘটে গেছে এই মানবিক বিপর্যয়। এর সঙ্গে আছে থ্যালিডোমাইড এর এনানটিউমারের রসায়ন, (S)-থ্যালিডোমাইড এবং (R)-থ্যালিডোমাইড, অর্থাৎ একজোড়া যৌগ যারা একটি আরেকটির প্রতিবিম্ব। এদের মধ্যে (S)-থ্যালিডোমাইড নতুন রক্তনালী তৈরিতে বাঁধা দেয় ফলে যে সকল অঙ্গে নতুন কোষ বিভাজন হয় তাদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে যে রক্তনালীর দরকার হয় তা তৈরি হয় না। ফলে নতুন অঙ্গ বা টিস্যুটির তৈরি হবার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়, পরিপূর্ণতা পায় না। যার ফলাফল হাজার হাজার থ্যালিডোমাইড-জনিত ত্রুটিপূর্ণ শিশুর জন্ম।

থ্যালিডোমাইড-জনিত বিকলাঙ্গতার রকমফের
থ্যালিডোমাইড এর কারণে বিভিন্ন রকম বিকলাঙ্গতা দেখা গেছে। এর মূল কারণ হল, মা যখন থ্যালিডোমাইড গ্রহণ করেছিলেন সেই মুহূর্তে ভ্রূণ বৃদ্ধির যে পর্যায়ে ছিল তা বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। যা সংশ্লিষ্ট অঙ্গের ত্রুটিপূর্ণ বিকাশ এর জন্য দায়ী। এখন এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে যে সন্তান ধারণের ২০ থেকে ৩৭ তম দিনের মধ্যে থ্যালিডোমাইড সেবন করলেই শুধু ভ্রূণের ত্রুটিপূর্ণ বিকাশ হয়। যেমন, সন্তান ধারণের ২০ তম দিনে থ্যালিডোমাইড গ্রহণ করলে কেন্দ্রীয় মস্তিষ্কের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়, ফলে বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবে নাজুক সন্তানের জন্ম হতে পারে। ২১ তম দিনে একটি ট্যাবলেট নিলে চোখের বিকাশে সমস্যা হতে পারে আবার, ২২-২৩ তম দিনে ট্যাবলেট নেয়া হলে কানের বৃদ্ধি কমে যেতে পারে অথবা মুখাবয়বে প্রভাব পরতে পারে। তেমনিভাবে, ২৪ তম দিনে থ্যালিডোমাইড হাতের বৃদ্ধি বন্ধ করে দিতে পারে আবার ২৫-২৮ এর মধ্যে সেবন করলে বন্ধ হয়ে যেতে পারে পায়ের বৃদ্ধি।
(R)-থ্যালিডোমাইড এর ব্যবহার কি সমাধান?
বিশ্লেষণী রসায়নের উন্নতির ফলে (R)-থ্যালিডোমাইড আলাদা করা সম্ভব। কিন্তু আমাদের কোষীয় পরিবেশে (R)-থ্যালিডোমাইড পরিবর্তিত হয়ে (S)-থ্যালিডোমাইড এ পরিণত হতে পারে। ফলে সমস্যা থেকেই যাচ্ছে।
থ্যালিডোমাইড কি শেখাল?
থ্যালিডোমাইড বিপর্যয় দেশে দেশে সরকার এবং চিকিৎসা কর্তৃপক্ষকে তাদের ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্য অনুমোদনের নীতি পর্যালোচনা করতে বাধ্য করেছিল। দুটি উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল, ক) প্রাণীর উপর করা পরীক্ষার ভিত্তিতে মানব ব্যবহারের উদ্দেশ্যে ঔষধ অনুমোদন নিষিদ্ধ করা হয় এবং খ) গর্ভবতী মহিলাদের জন্য অনুমোদন দেয়ার আগে ঔষধ যে নিরাপদ তার প্রমাণ দেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। ফলস্বরূপ, বিশ্বজুড়ে ওষুধ বিপণন, পরীক্ষা ও অনুমোদন কঠোর নিয়ন্ত্রণে আসে। ষাটের দশকেই গ্রুনেন্থল এবং ব্রিটিশ থ্যালিডোমাইড বিপণন কারী সংস্থা দ্যা ডিস্টিলার্স কোম্পানি বিচারের সম্মুখীন হয়। পরবর্তীতে তারা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে সহায়তা প্রদানের নিমিত্তে সমঝোতায় আসে। এভাবেই বিভিন্ন পক্ষ নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় থ্যালিডোমাইড সোসাইটি (https://www.thalidomidesociety.org/) এবং থ্যালিডোমাইড ট্রাষ্ট (https://www.thalidomidetrust.org/)।
থ্যালিডোমাইড এর একাল
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কুষ্ঠরোগ এর প্রশমন এর জন্য থ্যালিডোমাইড ব্যাবহার করে সফলতার পর ১৯৬৭ সালে অনুমোদন দেয়। ১৯৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড এন্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন থ্যালিডোমাইড অনুমোদন দেয় যা বর্তমানে কুষ্ঠরোগ এর পাশাপাশি ক্যানসার, মায়েলোমা, এর চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে। ইতোমধ্যে থ্যালিডোমাইড কীভাবে কাজ করে তা নিয়ে দুই হাজারের অধিক প্রকাশনা প্রকাশিত হয়েছে। ২০১০ সালে টোকিও ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজির হিরোশি হাণ্ডার নেতৃত্বাধীন একদল গবেষক প্রমাণ করেন যে এটি সেরেব্লন নামক প্রোটিনের সাথে যুক্ত হয়ে কোষীয় ব্যবস্থায় (Ubiquitination) কিছু প্রোটিন কে ধ্বংস করে। এই প্রোটিন গুলি কোষের বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন সরবরাহের জন্য যে ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর গুলি লাগে সেগুলির উৎপাদন এর জন্য দরকারি। পরিণামে, বর্ধনশীল কোষের প্রোটিন উৎপাদন রহিত হয় এবং শেষমেশ মারা যায়।
তথ্যসূত্র
- https://www.sciencemuseum.org.uk/objects-and-stories/medicine/thalidomide
- https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC2098660/
- https://www.acs.org/content/acs/en/molecule-of-the-week/archive/t/thalidomide.html
- https://science.sciencemag.org/content/343/6168/256/tab-pdf
- https://en.wikipedia.org/wiki/Thalidomide
- https://embryo.asu.edu/pages/us-regulatory-response-thalidomide-1950-2000
- https://science.sciencemag.org/content/327/5971/1345
