রবার্ট চার্লস হায়দার নামের এক তরুণ, যিনি বব হায়দার নামে বেশি পরিচিত, সদ্য গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেছেন লন্ডনের কিংস কলেজ থেকে। বিষয় ছিল রসায়ন ও পদার্থ বিজ্ঞান! দুটিই ভৌত বিজ্ঞানের বিষয়। উচ্চতর ডিগ্রি নিতে গেলে যেকোনো একটিই বেছে নেবার কথা। নিয়েছেনও তাই। রসায়নের রস আস্বাদনের জন্য ১৯৬১ সালে ভর্তি হয়ে গেলেন এই কলেজের রসায়ন বিভাগের পিএইচডি প্রোগ্রামে! কিংস কলেজ নিয়ে একটি কথা খুব শোনা যায়, “আপনি যে বিভাগেই পড়েন না কেন, কোন না কোন ভাবে তা স্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষণার সাথে জরিয়ে যাবেই”! এই মতবাদের বাইরে ববও যেতে পারলেন না! তিনি গবেষণা করতে লাগলেন এমিনো এসিড নিয়ে। তিনি এমন কিছু এমিন এসিড এর রসায়ন নিয়ে কাজ করলেন যারা একই সাথে একের অধিক ধরণের বিক্রিয়ার অংশ গ্রহণ করেতে পারে। ১৯৬৭ সালের দিকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জিত হল। একাডেমিয়াতে থেকে যাবার ইচ্ছা থেকে পোস্ট-ডক্টরাল কাজে লেগে গেলেন কিংস কলেজ এর সেন্ট থমাস মেডিক্যাল স্কুলে। এই সময়েই কিংস কলেজের প্রচলিত কথা আর কাজের মিল আরও বেশি করে অনুভব করলেন! রসায়ন আর পদার্থ বিদ্যা পড়ে আসা বব এর সামনে তখন ফার্মাকোলজি, প্রাণরসায়ন, অণুজীব বিজ্ঞান, আণবিক জীববিদ্যার স্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষণায় নিজের রসায়ন এর দক্ষতা কীভাবে কাজে লাগানো যায় তার চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ এ মত্ত হয়ে পড়লেন, কেটে গেল আরও ৩টি বছর। বছর তিনেক পরে, ১৯৭০ সালে, একাডেমিয়াতে যোগ দিলেন। লন্ডন থেকে আশি মাইল দূরের এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয় এর রসায়ন বিভাগে!

শুরু থেকেই বব এর গবেষণা সংক্রান্ত কাজকর্ম এর মাঝে জীববিজ্ঞান এর গভীর ছাপ ছিল। কারণ উনি রসায়ন বিভাগে যোগ দিয়েছিলেন প্রথম বায়োলজিক্যাল কেমিস্ট্রির প্রভাষক হিসেবে। যার সাথে “King’s Exposure” এর একটা যোগসূত্র ছিল! গবেষণায় বব গাছপালা, জীব, অণুজীব থেকে মানব স্বাস্থ্য সব জায়গায় বিচরণ করেছেন নিজের রসায়নের দক্ষতা দিয়ে। উদাহণস্বরূপ বলা যায়, বন্য মটরশুঁটিতে নতুন এমিনো এসিড ল্যাথিরিন (Lathyrine) কীভাবে সংশ্লেষ হয় তা নিয়ে উনার গবেষণা প্রবন্ধ আছে! সাপের বিষের এমিনো এসিড গুলি নিজেদের মধ্যে কীভাবে ক্রিয়া বিক্রিয়া করে একটি সুস্থিত কাঠামো (Secondary structure) তৈরি করে তা নিয়েও গবেষণায় বুদে ছিলেন কিছুদিন! আবার কাজ করেছেন মৌমাছির পেপটাইড মেলিটিন এবং কোষীয় মেমব্রেন এর লিপিড লেয়ার এর সাথে মিথস্ক্রিয়া নিয়েও! এসব নিয়ে কাজ করেত করতে একসময় কাজ করেন E. coli ব্যাকটেরিয়া এর এক প্রোটিন এন্টেরোবেক্টিন নিয়ে যা আয়রন বা লৌহ আহরণ করতে সাহায্য করে! পরবর্তীতে এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয় বায়োলজিক্যাল কেমিস্ট্রির ডিগ্রী দেয়া শুরু করেছিল যার মূল কারিগর ছিলেন বব হায়দার!

এসেক্সে এ দারুণ সময় কাটছিল। এরমধ্যে সময় হল সাব্বাটিক্যাল ছুটির! এই ছুটির বিষয় টি খুব মজার। একটি নির্দিষ্ট সময় কাজ করে ফেললে ১ বছরের ছুটি পাওয়া যায় পূর্ণ বেতনে। একাডেমিয়া তে যারা কাজ করে তাদের জন্য ব্যাপারটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিজের পছন্দের সাথে মিল রেখে নতুন ধারণা আর দক্ষতা অর্জন করার এক মোক্ষম সুযোগ আসে এর মাধ্যমে।
বায়োলজিক্যাল কেমিস্ট্রির নানা বিষয়ে কাজ করতে করতে বব হায়দারের মনে ধরলো ব্যাকটেরিয়ার আয়রন বা লৌহ আহরণ করে জীবন ধারণের রসায়নের বিষয়টি! কারণ এতে জীববিজ্ঞানে রসায়নের দক্ষতা দেখানোর অনেক সুযোগ আছে। আমাদের পৃথিবীতে যে সকল মৌলিক পদার্থ অঢেল পরিমাণে পাওয়া যায় তাদের মধ্যে লৌহ এর স্থান চতুর্থ! আর জৈব বিপাক কর্মে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। কিন্তু যে অবস্থায় থাকলে তা আহরণ এর জন্য সুবিধাজনক হয় লৌহ সে অবস্থায় প্রকৃতিতে থাকে না! এসব ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়া খুবই স্মার্ট! এরা একধরনের কেমিক্যাল তৈরি করে পরিবেশে ছেড়ে দেয়, যা সিডেরোফোর (Siderophores) নামে পরিচিত। এদের কাজ হল খনিজ লৌহ এর সাথে রাসায়নিক বন্ধন তৈরি করা। এরা বন্ধন এমন ভাবে তৈরি করে যাতে লৌহ টি সবসময় কেন্দ্রে থাকে, ফলে নতুন এক ধরনের যৌগ তৈরি হয় যাকে সাধারণ ভাবে বলে কিলেট (Chelate), একবার কিলেট তৈরি হলে ধাতব লৌহের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য (চার্জিত অবস্থার) পরিবর্তন হয়। যা পরবর্তীতে ব্যাকটেরিয়ার বাইরের প্রাচীর বা মেমব্রেন ভেদ করে লৌহ ভেতরে ঢুকতে সাহায্য করে! এসকল পদার্থকে আয়রন কিলেটর (Chelator) বলা হয়।
আমরা হয়তো থ্যালাসেমিয়া রোগের নাম শুনেছি, যার ফলে রক্তশুন্যতা দেখা দেয়! আবার এটা যেহেতু বংশগত বা জেনেটিক রোগ, তাই সবচেয়ে সহজ চিকিৎসা হল অন্যের কাছ থেকে রক্ত নিয়ে রোগীর দেহে দেয়া। সমস্যা হল এটা নিয়মিত করতে হয়! এর ফলে যা হয় রোগীর দেহে রক্তশুন্যতার উপশম হয় কিন্তু দেখা দেয় লৌহের আধিক্য! সেখানেই আয়রন কিলেটর বা সিডেরোফোর এর প্রয়োজনীয়তা! তখন ১৯৭৭ সাল! বাজারে তখন যে প্রচলিত সিডেরোফোর বা আয়রন কিলেটর, যা স্ট্রেপ্টোমাইসেস পিলোসাস (Streptomyces pilosus) ব্যাকটেরিয়া থেকে প্রথম আবিষ্কার করা হয়েছিল, ছিল তার নাম ডেফেরক্সামিন (®Desferal)। এটা দিতে হতো ইন-ফিউশন আকারে, মুখে খবর উপযোগী ছিল না। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, প্রায়োগিক ঝামেলা এবং মাত্রা অনুযায়ী উচ্চমূল্যের কারণে একটি স্বল্পমূল্যের এবং মুখে গ্রহণের উপযুক্ত একটি নতুন ঔষধ তৈরি তখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়ায়! এমন অবস্থায় বব হায়দার তার সাব্বাটিক্যাল ছুটি কালীন সময়ে গবেষণার জন্য বেছে নিলেন ক্যালিফোর্নিয়ার ইউসি বার্কলের প্রফেসর নেইলেন্ডস এর গ্রুপ কে। যারা ছিল বিভিন্ন অণুজীব থেকে প্রাপ্ত সিডেরোফোর থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান নিয়ে সিনথেটিক আয়রন কিলেটর কীভাবে ক্রমে ক্রমে তৈরি করা যায় তার জন্য বিখ্যাত! এখানে উল্লেখ্য যে, প্রাকৃতিক ভাবে পাওয়া আয়রন কিলেটর এর আকার বড় এবং গঠন একটু জটিল হয়। ঐ এক বছর কাজ করার সময়ই বব হায়দারের মাথায় ডেফেরিপ্রোন এর ধারণা আসে। যার ধারণার মূল ভিত্তি ছিল কয়েকটি বৈশিষ্ট এর (যেমন সিডেরোফোর এর আকার, লৌহের সাথে কিলেট করার পর চার্জ, মেমব্রেন এর আচরণগত বৈশিষ্ট্য) সম্মিলিত রসায়ন! এসেক্স এ ফিরে পরের তিন বছরে (১৯৭৯-১৯৮১) প্রফেসর বব সেরে ফেলেন নতুন কিলেটর সংশ্লেষণ এর কাজ। যার নাম ডেফেরিপ্রোন এবং এর গঠন খুব সাধারণ, কিন্তু এর লৌহ প্রীতি অসাধারণ! পরের বছর গুলিতে দেখে ফেললেন মেমব্রেন এর সাথে ডেফেরিপ্রোন এবং লৌহের রসায়ন কেমন জমে! সেখান থেকে সবুজ সংকেত পেলে সেরে ফেললেন প্রাণীদেহের উপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা।

অন্যদিকে, সে সময় লন্ডনের রয়েল ফ্রি হাসপাতালে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের ডেফেরক্সামিন দিয়ে চিকিৎসা করছিলেন ভিক্টর হফব্রেন্ড নামের এক জাদরেল চিকিৎসক! একসময় তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন যে এই ঔষধ আর ভালো ভাবে কাজ করছে না! অনেক রোগী লৌহের আধিক্যের দরুণ মৃত্যুর মুখে পতিত হতে যাচ্ছে! সে সময়, ১৯৮২ সালে, ডেফেরিপ্রোন এর পেটেন্ট গৃহীত হয় গ্রেট ব্রিটেন এ। তখনই তিনি উদ্যোগী হয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন ডেফেরিপ্রোন এর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করবেন যত শীঘ্র সম্ভব! অবশেষে প্রাণীদেহে আরও অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করে ১৯৮৭ সালে রয়েল ফ্রি হাসপাতালে শুরু হয় ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল। সেবছর বব হায়দার কিংস কলেজ লন্ডনের ফার্মেসি বিভাগে যোগ দেন। ফলে দুজনের কাজের রসায়নে আরো গতি আসলো। তারপর আরও কঠিন পথ পারি দিতে হয়েছে ডেফেরিপ্রোনকে! কারণ এর প্রয়োগে মানবদেহে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছিল! মূল অভিযোগ ছিল আগ্রুনোলসাই্টোসিস, যার ফলে ইমিউন সিস্টেম এর নিউট্রফিল এর পরিমাণ কমে যায়। সাথে কেউ কেউ যকৃৎ এ ফাইব্রোসিস হয় এমন অভিযোগও করছিলেন! এভাবে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত নানাবিধ অভিযোগ উঠতে থাকে।
আয়রন বা লৌহ বেড়ে গেলে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পরে মানবদেহের বড় বড় অঙ্গ সমূহ, যেমন যকৃৎ, হার্ট, কিডনি! কারণ হল এদের টিস্যু এর গঠন একটি থেকে আরেকটি ভিন্ন! এবং ততদিনে যে সকল আয়রন কিলেটর বাজারে ছিল সেগুলি সাধারণ টিস্যু হতে লৌহ বের করে আনতে পারলেও হার্ট থেকে বের করে আনতে পারতো না! ফলে থ্যালাসেমিয়ার রোগী বেশ কয়েক বছর রক্ত সঞ্চালন এবং আয়রন কিলেটর এর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বেঁচে থাকলেও এক সময় হঠাৎ করে হার্ট এটাক করে মারা যেতো। এমতাবস্থায়, ১৯৯৬ সালের দিকে ডেফেরিপ্রোন নিয়ে কিছু আশাব্যঞ্জক ফল আসে। ডেফেরিপ্রোন হার্ট থেকে লৌহ বের করে আনতে পারে এমন প্রমাণ পাওয়া যায়! যা থ্যালাসেমিয়া রোগীদের আয়ু বাড়াতে সক্ষম! এবং অবশেষে ১৯৯৯ সালে ইউরোপীয় ঔষধ প্রশাসন (EMA) ডেফেরিপ্রোন মানব শরীরে প্রয়োগের অনুমোদন দেয়। তারপর তা বাজারজাত করার লাইসেন্স পায় এপোটেক্স (Apotex)। পরবর্তীতে ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এবং ২০১৫ সালে কানাডায় ডেফেরিপ্রোন ব্যাবহারের অনুমতি মিলে।
প্রফেসর বব হায়দার কিংস কলেজ লন্ডনের একাডেমিক দায়িত্ব থেকে অবসরে যান ২০০৯ সালে। তারপর থেকে এখনো প্রফেসর ইমেরিটাস হিসেবে যুক্ত আছেন। এই সময়ের মাঝে ডেফেরিপ্রোন এর পরবর্তী প্রজন্মের আয়রন কিলেটর ক্রমে ক্রমে তৈরি করেছেন। যা এখন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে আছে। সেই ১৯৭০ থেকে অদ্যাবধি একটি পরবর্তী প্রজন্মের আয়রন কিলেটর তৈরি করতে কাজ করে চলেছেন! প্রায় বাংলাদেশের সমান উনার গবেষণার যাত্রা! এ যাত্রায় উনার সাথে কাজ করে পিএইচডি নিয়েছেন ৬৭ জন। এখন প্রতি বৃহস্পতিবার কিংস কলেজ এর রসায়ন ল্যাব এ বব হায়দার এর দেখা মেলে। তিনি কাজ করে যান আপন মনে, আয়রন কিলেটর এর রসায়ন আর একটু বুঝতে! যিনি বিশ্বাস করেন “প্রতিটি জটিল সমস্যার সমাধান লুকিয়ে থাকে সহজ ধারণার মধ্যে!
